ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না তার উত্তর এখন মূলত নির্ভর করছে ভারতের অবস্থানের ওপর। সিএনএন-এর এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিতিতে দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা বর্তমানে নয়াদিল্লিতে লুকিয়ে আছেন; গত আগস্টে ক্ষমতা হারানোর পর সেখানেই আশ্রয় নেন তিনি।
ঢাকা চায় তাকে ফেরত এনে রায় কার্যকর করতে, কিন্তু প্রত্যর্পণেই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত। ছাত্র ও জনতার বিক্ষোভে পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে ভারত পালিয়ে যাওয়া সাবেক এই নেতা এখন দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছেন। ভারতের সতর্ক নিরপেক্ষতা একটি জটিল কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুবাশ্বার হাসান বলেন, জনগণের তীব্র ক্ষোভের মুখে দেশ ছাড়াই ছিল তার একমাত্র পথ। ভারত-নির্বাসন ও মৃত্যুদণ্ড সব মিলিয়ে ‘অসাধারণ’ এক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি তৈরি করেছে।
১৯৭৫ সালে পরিবারের গণহত্যার পর জার্মানিতে অবস্থানরত হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। পরে ভারতের ছয় বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় গিয়ে পরিবারের হত্যাকারীদের বিচারের ঘোষণা দেন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈরিতা, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, দেশকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর তিনি হয়ে ওঠেন আরও শক্ত-মনের, ক্ষমতা-কেন্দ্রিক নেতা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বিরোধীদের দমন, ভীতি ছড়ানো ও একদলীয় শাসনের অভিযোগ বাড়তে থাকে।
সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ দ্রুতই দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপ নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সরকারের দমন-পীড়নে এক হাজার চারশর বেশি মানুষ নিহত হয়। ভয়ঙ্কর রক্তপাতও জনরোষ থামাতে পারেনি; বরং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে হাসিনার সরকার।
হাসান বলেন, পালিয়ে যাওয়া ছিল তার অপরাধ স্বীকারের নীরব ইঙ্গিত ‘তিনি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন; জনগণ ও রাষ্ট্রযন্ত্র তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।’
অনুপস্থিতিতে বিচার করে তাকে বিক্ষোভকারীদের হত্যায় উসকানি, ফাঁসির নির্দেশ ও দমন-পীড়নে প্রাণঘাতী প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত বলেছে, ছাত্র হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ সরাসরি তিনিই দিয়েছিলেন।
ভারত মৃত্যুদণ্ড আইন বজায় রাখলেও হাসিনার বিষয়ে তারা ‘নিরপেক্ষ’ ও ‘সব পক্ষের সঙ্গে যুক্ত থাকার’ অবস্থান নিয়েছে। এদিকে হাসিনা–পরিবার ভারতের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছে। সজীব ওয়াজেদ বলেন, "ভারত তার মায়ের জীবন রক্ষা করেছে।"
ভারতীয় কূটনীতিক অনিল ত্রিগুণায়েত মতে, প্রত্যর্পণ চুক্তির রাজনৈতিক অপরাধ সংক্রান্ত ধারা দিল্লিকে হাসিনাকে ফেরত পাঠানো থেকে বিরত থাকার সুযোগ দেয়। তাছাড়া তিনি এখনো আপিলসহ সব আইনি পথ ব্যবহার করেননি তাই ভারত কোনো তাড়া দেখাচ্ছে না।
মামলার দিনই বাংলাদেশ ভারতকে ‘অবিলম্বে’ তাকে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানায়। তবে দিল্লির প্রতিক্রিয়া শীতলই থাকে।
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই মৃত্যুদণ্ড আরও উত্তেজনা তৈরি করেছে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বহীন; অধ্যাপক ইউসুফের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার মেরুকৃত রাজনীতিকে শান্ত করার চ্যালেঞ্জে পড়েছেন।
অনেকের মত, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিএনপি ও ছোট দলগুলোর জন্য পথ খুলে দিচ্ছে; তবে গভীর বিভাজন এখনও অমীমাংসিত।
সিএনএন বলছে, তিন দশকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারতের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা হাসিনাকে ফেরত দেবে কি না। দিল্লির সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে: ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, নাকি ঝুলে থাকবে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।