ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি–এর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর দেশটি প্রবেশ করেছে এক গভীর অনিশ্চয়তার সময়ে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাসে এমন সংকট খুব কমই এসেছে। এটি কেবল নেতৃত্ব হারানোর ঘটনা নয়; বরং পুরো শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্নের সূচনা।
এখন ইরানের সামনে কোন পথ খোলা থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরে কারা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন তার ওপর। একপক্ষ প্রতিশোধ ও কঠোরতার পথে যেতে চাইতে পারে—যার বাস্তব সুফল অনিশ্চিত। অন্যপক্ষ বুঝতে পারে, দীর্ঘদিনের কৌশল আর টিকছে না, এবং হয়তো এখনই আলোচনার দরজা খোলার শেষ সুযোগ।
দীর্ঘ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে সুবিধাভোগের সংস্কৃতি ইরানকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে শুধু বাইরের চাপ নয়, প্রশাসনিক অদক্ষতাও এই অবস্থার জন্য দায়ী। তবু ইরান এখনো মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় শক্তি—যার ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা ও সম্পদ তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে রেখেছে।
প্রায় ৯ কোটি মানুষের এই দেশে রয়েছে উচ্চশিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ইউরোপ–উত্তর আমেরিকায় বিস্তৃত শক্তিশালী প্রবাসী সমাজ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস ও চতুর্থ বৃহত্তম তেলের মজুত, পাশাপাশি সোনা ও তামার মতো খনিজ সম্পদ ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
আগামী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ অনেক কিছু স্পষ্ট করে দিতে পারে। কট্টরপন্থীরা যদি প্রতিশোধের রাজনীতি বেছে নেন, তাহলে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা হতে পারে। আবার বাস্তবতা মেনে আলোচনার পথে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন তাঁরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের নেতৃত্ব চাইলে এখনো একটি সমঝোতার সুযোগ পেতে পারে। সংঘাত না বাড়িয়ে ছাড় বা আলোচনার পথে গেলে বড় ধরনের হামলা, কঠোর শাস্তি কিংবা শাসনব্যবস্থার পতনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে এই সুযোগ হাতছাড়া হলে পরিণতি আরও কঠিন হতে পারে।
ইরান সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে যাবে—এমন সম্ভাবনা আপাতত কম। কুর্দি ও বালুচ জনগোষ্ঠীকে ঘিরে কিছু অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন থাকলেও আজারিদের মতো বড় জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রকাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিজেও আজারি বংশোদ্ভূত, যা এই সংযোগকে আরও দৃঢ় করে।
দেশের বাইরে থাকা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে সাবেক শাহের পুত্র রেজা পাহলভি, সরকার পতনের আহ্বান জানালেও দেশের ভেতরে তাঁদের প্রকৃত সমর্থন কতটা—তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রবাসী ইরানিদের মধ্যে তাঁদের প্রভাব ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।
খামেনির অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে। গত বছরের যুদ্ধের পরই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ‘সময় ক্ষেপণ ও এড়িয়ে যাওয়ার’ কৌশল আর কাজ করছে না। খামেনির মৃত্যুর আগে আলী লারিজানিকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। এখন লারিজানি ও প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে—তবে সিদ্ধান্তটি হবে অত্যন্ত কঠিন।
ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি হলো ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পূর্ণ অবসান, পাশাপাশি রাজনৈতিক উন্মুক্ততা ও অবাধ নির্বাচনের পথ তৈরি। এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া মানে শাসনব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তরের দিকে যাওয়া।
ইরানের সঙ্গে চীন ও রাশিয়া–র ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন ইরানের বড় বিনিয়োগকারী ও তেল ক্রেতা, আর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানি ড্রোন ব্যবহার করেছে। বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই দুই দেশের আঞ্চলিক স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খামেনির মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিনের দমন–পীড়নের স্মৃতি সহজে মুছে যাবে না। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনে হাজার হাজার তরুণ নিহত হওয়ার অভিযোগ ইরানি সমাজে গভীর ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিপ্লবী গার্ড সদস্যদের বাড়িতে লাল চিহ্ন দেওয়ার ঘটনাগুলো জনরোষ ও সম্ভাব্য প্রতিশোধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের ভবিষ্যৎ এখন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কোন পথে দেশটি এগোবে—সংঘাত, সমঝোতা না কি অভ্যন্তরীণ রূপান্তর—সে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ইরানিদের হাতেই।
প্যাট্রিক গিবন্স, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কূটনৈতিক—অস্ট্রেলিয়ান ফিন্যানশিয়াল রিভিউ থেকে সংক্ষিপ্ত ও রূপান্তরিত অনুবাদ