অতিরিক্ত চুল পড়া, অবহেলা নয়
অতিরিক্ত চুল পড়া, অবহেলা নয়
বিস্তারিত কমেন্টে ...

প্রকাশিত : ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:১৬ রাত

প্রতিবেদক : Tanjir Jannat Koly

অতিরিক্ত চুল পড়া, অবহেলা নয়

ফাইল ছবি

আবহাওয়া বদল, নতুন শ্যাম্পু ব্যবহার কিংবা মানসিক চাপ এসব কারণে সাময়িকভাবে চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে। তবে এসবের কোনোটি না থাকলেও যদি হঠাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চুল ঝরতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, অতিরিক্ত চুল পড়ার পেছনে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন পরিবর্তন বা পুষ্টির ঘাটতিও দায়ী হতে পারে।

প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু বালিশ, চিরুনি, গোসলের পানি কিংবা পোশাকে আগের তুলনায় বেশি চুল দেখতে থাকলে এর কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।

হঠাৎ চুল পড়া কেন বাড়ে?

চুলেরও একটি স্বাভাবিক জীবনচক্র রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় ধরে চুল বাড়ার পর তা বিশ্রামপর্বে যায় এবং পরে ঝরে পড়ে। তবে শরীরে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটলে একসঙ্গে অনেক চুল বিশ্রামপর্বে চলে যেতে পারে। এর কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর হঠাৎ অতিরিক্ত চুল পড়া শুরু হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় টেলোজেন ইফলুভিয়াম

আয়রনের ঘাটতি

অতিরিক্ত চুল পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে শরীরে আয়রনের ঘাটতি। আয়রন কমে গেলে রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে চুলের গোড়া প্রয়োজনীয় পুষ্টি না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব

শুধু আয়রন নয়, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ ও প্রোটিনের ঘাটতিও চুলের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি থাকলে চুল পাতলা ও দুর্বল হয়ে ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।

দ্রুত ওজন কমানো

হঠাৎ ওজন কমানোর চেষ্টা, ক্র্যাশ ডায়েট কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার খাওয়ার কারণেও চুল পড়া বাড়তে পারে। পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টি না পেলে শরীর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে চুলের বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো পিছিয়ে যেতে পারে।

মানসিক চাপ ও অসুস্থতা

তীব্র মানসিক চাপ, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, জ্বর কিংবা অস্ত্রোপচারের পরও কিছু মানুষের চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে। অনেক সময় শারীরিক ধাক্কার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর এর প্রভাব চুলে দেখা যায়।

থাইরয়েডের সমস্যা

থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলেও চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা অতিরিক্ত ঝরে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘদিন চুল পড়ার পাশাপাশি অন্য শারীরিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও পিসিওএস

নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিশেষ করে অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বেড়ে গেলে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। পিসিওএসের ক্ষেত্রেও এমন সমস্যা হতে পারে।

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ ব্যবহারের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও চুল পড়া বাড়তে পারে। তাই নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর হঠাৎ চুল পড়া বেড়ে গেলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানানো উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়।

বড় ধরনের সংক্রমণের পর

কোভিড-১৯সহ কিছু বড় ধরনের সংক্রমণ বা অসুস্থতার পর কয়েক মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত চুল পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক এবং শরীর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে চুল পড়ার পরিমাণও কমে আসে।

সন্তান জন্মের পর চুল পড়া কি স্বাভাবিক?

গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারীর চুল তুলনামূলক ঘন ও সুন্দর দেখায়। সন্তান জন্মের পর হরমোনের মাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হলে একসঙ্গে অনেক চুল ঝরে যেতে পারে। একে পোস্টপার্টাম হেয়ার লস বলা হয়।

সাধারণত সন্তান জন্মের কয়েক মাস পর এ সমস্যা শুরু হতে পারে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে কমে যায়।

চুল পড়ার সঙ্গে যেসব লক্ষণ খেয়াল করবেন

অতিরিক্ত চুল পড়ার পাশাপাশি নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন—

  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা
  • ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • মাথা ঘোরা
  • শ্বাসকষ্ট
  • নখ সহজে ভেঙে যাওয়া
  • নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়ম

এসব উপসর্গ থাকলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

কয়েক দিন চুল একটু বেশি পড়লেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তিন মাসের বেশি সময় ধরে চুল পড়া চলতে থাকলে, চুল ক্রমেই পাতলা হয়ে মাথার ত্বক দৃশ্যমান হলে কিংবা অন্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রয়োজনে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা করে আয়রন, ভিটামিনসহ বিভিন্ন পুষ্টির মাত্রা এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার বিষয়টি যাচাই করতে পারেন। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং কারণ না জেনে নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু না করাই ভালো।

শেষ কথা

হঠাৎ চুল পড়া বাড়লেই তা গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক এবং শরীরের কোনো পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া। তবে দীর্ঘদিন সমস্যা চললে কারণটি চিহ্নিত করা জরুরি। সময়মতো সঠিক কারণ জানা গেলে চুল পড়ার সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা অনেক সহজ হতে পারে।

  • সর্বশেষ