দোয়ার সময় কান্না না এলে কি কমে যায় দোয়ার ফজিলত?
দোয়ার সময় কান্না না এলে কি কমে যায় দোয়ার ফজিলত?
বিস্তারিত কমেন্টে ...

প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:০২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দোয়ার সময় কান্না না এলে কি কমে যায় দোয়ার ফজিলত?

ফাইল ছবি

আল্লাহর কাছে দোয়া করার সময় কান্না ও অশ্রু মুমিনের বিনয়, অনুতাপ ও আল্লাহভীতির প্রকাশ হতে পারে। তবে অনেকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দোয়ার সময় চোখে পানি আসে না। এ অবস্থায় দোয়ার ফজিলত বা কবুলিয়াত কমে যায় কি না এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে।

ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দোয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্তরের উপস্থিতি, আন্তরিকতা, বিনয়, আল্লাহভীতি এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা। চোখের পানি এসব অনুভূতির একটি প্রকাশ হতে পারে, তবে দোয়া কবুলের জন্য কান্না কোনো আবশ্যিক শর্ত নয়।

দোয়ার সময় চোখে পানি না এলে কি ফজিলত কমে?:

দোয়ার সময় চোখে পানি না এলেও এর ফজিলত কমে যায় না। মানুষের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের ধরন এক নয়। কেউ সহজেই আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদেন, আবার কেউ গভীর অনুশোচনা বা আল্লাহভীতি অনুভব করলেও চোখে পানি আনতে পারেন না।

তাই শুধু চোখের পানিকে দোয়ার আন্তরিকতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং বান্দার অন্তরের অবস্থা, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং দোয়ার সময় তার মনোযোগ ও বিনয় গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিসে দোয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতা থেকে সতর্ক করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু মুখে দোয়া পড়ার পরিবর্তে অন্তরকে আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট রাখা জরুরি।

কান্নার চেষ্টা করা কি ভালো?

দোয়া বা কোরআন তিলাওয়াতের সময় স্বাভাবিকভাবে কান্না এলে তা আল্লাহভীতি ও বিনয়ের সুন্দর প্রকাশ। আর কান্না না এলে অন্তরকে নরম করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

হাদিসে কোরআন তিলাওয়াতের সময় কান্নার কথা বলা হয়েছে। কান্না স্বতঃস্ফূর্তভাবে না এলে কান্নার ভাব সৃষ্টি করার কথাও বর্ণিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো অন্তরে আল্লাহর ভয়, বিনয় ও অনুভূতি জাগ্রত করা।

তবে কৃত্রিমভাবে মানুষের দেখানোর জন্য কান্না করা বা নিজের আমলকে প্রদর্শন করা ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইবাদতের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ইখলাস বা আন্তরিকতা।

আল্লাহভীতিতে কান্নার বিশেষ মর্যাদা

আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসায় চোখের পানি ঝরা নিঃসন্দেহে মর্যাদাপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং এতে তাদের বিনয় আরও বৃদ্ধি পায়। (সুরা ইসরা: ১০৯)

হাদিসেও আল্লাহভীতিতে ঝরা অশ্রুর বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর ভয়ে ঝরা অশ্রুকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে বর্ণনা করেছেন। একইভাবে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে যার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, তাকেও কিয়ামতের দিন বিশেষ মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করার সময় তাঁর ভয়ে চোখের পানি ফেলেন, তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। (সহিহ বুখারি: ৬৬০; সহিহ মুসলিম: ১০৩১)

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহভীতিতে কান্না করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দোয়া কবুল বা দোয়ার ফজিলত পাওয়ার জন্য অবশ্যই চোখে পানি আসতে হবে।

চোখে পানি না এলেও দোয়া করুন

মানুষের অনুভূতি প্রকাশের ধরন আলাদা। তাই দোয়ার সময় কান্না না আসায় নিজের দোয়া নিয়ে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, ভুল-ত্রুটি ও অনুতাপের কথা তুলে ধরা উচিত।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির: ৬০)

এই আয়াত বান্দাকে আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্য উৎসাহিত করে। তাই চোখে পানি আসছে কি না সেটিকে দোয়ার মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড বানানো উচিত নয়।

অন্তরকে নরম করার চেষ্টা করুন

দোয়ার সময় কান্না না এলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব, নিজের দুর্বলতা, গুনাহ ও তাঁর নেয়ামতগুলো স্মরণ করা যেতে পারে। এতে অন্তরে বিনয় ও আল্লাহভীতি জাগ্রত হতে পারে।

তবে নিজের অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে কান্নার অভিনয় করার চেয়ে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই গুরুত্বপূর্ণ। চোখে পানি না এলেও যদি অন্তর আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকে, অনুতাপ থাকে এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তাহলে দোয়া করা থেকে বিরত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

সুতরাং, দোয়ার সময় কান্না না এলে দোয়ার ফজিলত কমে যায় এমন ধারণা সঠিক নয়। কান্না আল্লাহভীতি ও বিনয়ের একটি সুন্দর প্রকাশ হলেও এটি দোয়ার আবশ্যিক শর্ত নয়। দোয়ার আসল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে আন্তরিকতা, বিনয়, একাগ্রতা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসের মধ্যে।

  • সর্বশেষ