শিল্পে গ্যাস সংকট কাটছে, সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক
শিল্পে গ্যাস সংকট কাটছে, সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক
বিস্তারিত কমেন্টে ...

প্রকাশিত : ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:০১ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শিল্পে গ্যাস সংকট কাটছে, সন্ধ্যা থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক

ফাইল ছবি

শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে প্রায় দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে আশাবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের নেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

সরকারের মেয়াদে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ দিতে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠন ও অ্যাপেক্স বডির নেতাদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর দেশের গ্যাস সরবরাহ অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন কারিগরি সমস্যার কারণে অচল থাকায় সরবরাহে সংকট তৈরি হয়। সরকার সেটি মেরামতের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে সচল দুটি এফএসআরইউয়ের পাশাপাশি ২০২৮ সালের মধ্যে সম্ভব হলে তৃতীয় একটি টার্মিনাল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশে মোট পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপনের লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ের কাজ সফল হলে আরও ১৫০টি কূপ খননের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হবে।

শুধু ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল না থেকে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং জাতীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানান মাহদী আমিন।

সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

তারেক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যার সমাধান ইতোমধ্যে করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, আগামীকাল (আজ) সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক থেকে দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরবে।’

গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। জিটুজি ভিত্তিতে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনালকে সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করেছে। এরপর সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা। তাই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সব সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান করা সম্ভব নয়।

সভায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। তবে সরকারের সামনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান কেবল ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি জড়িত।

তিনি বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমস্যাগুলোর ব্যাপ্তি ও জটিলতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় অবগত। সরকার কোনো বিষয় আড়াল না করে সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে এবং কীভাবে সেগুলোর সমাধান করা হবে, সেটিও জানিয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী সমাজ নয়, পুরো দেশ উপকৃত হবে।

দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণ সময়মতো সিদ্ধান্ত নেবে কাকে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে। তবে যে সরকার দায়িত্বে থাকে, তাকে তার পরিকল্পিত কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত।

গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সভায় আমন্ত্রণ জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে গণমাধ্যম পরিষ্কার ধারণা পেলে তা জনগণের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, বড় কোনো কাজ সফল করতে কার্যকর একটি দল প্রয়োজন। সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করছেন, যাতে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়।

ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা করবেন, যাতে আমরা আপনাদের জন্য আরও ভালো কিছু করতে পারি।’

বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা সম্পর্কে মাহদী আমিন বলেন, তেল, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে টেকসই সমন্বয় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বহুমুখী করার পাশাপাশি সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হবে।

মাহদী আমিন আরও জানান, সভায় ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন সমস্যার কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন। উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিরা দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

সরকারি ও বেসরকারি খাতকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই খাত একসঙ্গে কাজ করলে দেশকে সমৃদ্ধির পথে আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘ সময়ের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে দেশে বহু সংকট জমে উঠেছে। এসব সমস্যার সমাধান রাতারাতি, এক মাসে কিংবা এক বছরের মধ্যে করা কঠিন। তবে বর্তমান সরকারের এসব সংকট মোকাবিলায় পূর্ণ সদিচ্ছা, আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।

  • সর্বশেষ