সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আবারও হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা অবহেলা করলে মারাত্মক জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তবে সময়মতো টিকা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে এ রোগ থেকে সহজেই সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
হাম কেন হয়?
হামের জন্য দায়ী মিজলস ভাইরাস, যা প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দিলে ভাইরাসযুক্ত ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। একই পরিবেশে থাকা সুস্থ ব্যক্তি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সেই ভাইরাস শরীরে গ্রহণ করলে সংক্রমিত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটি বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে না এসেও একই কক্ষে অবস্থান করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
হামের লক্ষণ
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সাধারণত ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। শুরুতে অনেকেই সাধারণ সর্দি-জ্বর মনে করলেও পরে হামের স্বাভাবিক লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়।
প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর
শুকনো কাশি
নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া
চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পানি পড়া
মুখের ভেতরে ছোট ছোট সাদা দাগ (কপলিক স্পটস)
মুখ বা কানের পাশ থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লালচে ফুসকুড়ি
লক্ষণ প্রকাশের প্রায় চার দিন আগে থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। ফুসকুড়ি ওঠার পরও আরও চার দিন পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?
অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে উঠলেও কিছু ক্ষেত্রে হাম গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে—
নিউমোনিয়া
তীব্র ডায়রিয়া
কানের সংক্রমণ
মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
শরীরে পানিশূন্যতা
বিরল ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি
হামের চিকিৎসা
হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো রোগীর উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য যা জরুরি—
পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা
প্রচুর পানি ও তরল খাবার পান করানো
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল ব্যবহার
শিশুর বয়স অনুযায়ী টানা দুই দিন উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ প্রদান
যদি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে—
শ্বাসকষ্ট
বারবার বমি
খিঁচুনি
অতিরিক্ত দুর্বলতা
খাবার বা পানি একেবারেই না খাওয়া
অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা অচেতনভাব
হামের প্রতিরোধের উপায়
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী—
৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ
১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ
এছাড়া আরও কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি—
নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া
হাঁচি-কাশির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা
চোখ, নাক ও মুখে অপ্রয়োজনীয়ভাবে হাত না দেওয়া
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
ফুসকুড়ি দেখা দিলে অন্তত পাঁচ দিন রোগীকে আলাদা রাখা
শেষ কথা
হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা এবং নির্ধারিত সময়ে টিকা নিশ্চিত করা হলে এ রোগের অধিকাংশ জটিলতা এড়ানো সম্ভব। সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই শিশুদের হামের ঝুঁকি থেকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।